Header Ads

 




প্রতিষ্ঠান প্রধান একাই কি বিদ্যালয় বদলাতে পারেন? মিথ বনাম রূঢ় বাস্তবতা

সমাজের একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে— একজন দক্ষ প্রতিষ্ঠান প্রধান চাইলেই একটি বিদ্যালয়ের সার্বিক চিত্র বদলে দিতে পারেন। সূচকের প্রতিটি মানদণ্ডে তিনি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে যেতে পারেন সাফল্যের শিখরে। কথাটি শুনতে যতটা আদর্শিক, বাস্তবতার জমিনে তা ঠিক ততটাই অন্তঃসারশূন্য। যে সকল প্রতিষ্ঠান ভালো ফলাফল বা সুনামের শিখরে পৌঁছেছে, সেখানে কেবল প্রতিষ্ঠান প্রধানের একক কোনো ভূমিকা নেই; বরং সেখানে রয়েছে সকল শিক্ষক, কর্মচারী, ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি), শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সম্মিলিত কাজ করার মানসিকতা। একটি বিদ্যালয় হলো একটি রথের মতো, যার সারথি হয়তো প্রতিষ্ঠান প্রধান, কিন্তু এর চালিকাশক্তি হলেন শিক্ষকমণ্ডলী। শিক্ষকরা যদি একযোগে রথ না টানেন, তবে সারথির পক্ষে এক ইঞ্চিও এগোনো সম্ভব নয়।



পেশাদারিত্বের সংকট ও প্রযুক্তির অপব্যবহার

শিক্ষকতা কোনো সাধারণ পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বর্তমান সময়ে অনেক শিক্ষক এটিকে নিছক '১০টা-৪টার চাকরি' হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিদ্যালয়ের প্রায় শতভাগ কাজ অনলাইনভিত্তিক হওয়ায় প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগ থাকে। এর সুবাদে শিক্ষকদের হাতেও থাকে অবাধ ইন্টারনেট সুবিধা। দেখা যায়, যে সময়টি একজন শিক্ষককে পরবর্তী ক্লাসের প্রস্তুতির জন্য দেওয়া হয়েছে, সেই অবসর সময়ে তিনি শিক্ষামূলক কাজের প্রস্তুতি না নিয়ে স্মার্টফোনে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকছেন। সেখানে নিজের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কন্টেন্ট, সত্য-মিথ্যা গুজব বা সামাজিক অবক্ষয়ের নানা বিষয় দেখছেন, মন্তব্য করছেন বা শেয়ার করছেন। অনেক সময় এতটাই উচ্চশব্দে ভিডিও চালান যে, তা পাশের সহকর্মীর জন্যও বিরক্তি ও সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

চেইন অব কমান্ডের অভাব ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ

বর্তমানে শিক্ষকদের মধ্যে চেইন অব কমান্ড বা সিনিয়র-জুনিয়র শ্রদ্ধাবোধ চরমভাবে উপেক্ষিত। অনেকের মধ্যে উচ্চতর ডিগ্রি বা বেশি সনদের কারণে এক ধরনের অহমিকা কাজ করে। "আমি অন্যের চেয়ে বেশি জানি", "প্রধান শিক্ষকের চেয়ে আমার যোগ্যতা বেশি", "সবাই সমান ও সম-অধিকারের অধিকারী"— এমন আত্ম-অহংবোধ থেকে তারা প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিধিসম্মত নির্দেশনা মানতে চান না।

সবচেয়ে দৃষ্টিকটু বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠান প্রধান যদি কোনো শিক্ষকের চেয়ে বয়সে ছোট হন বা চাকরিতে পরে যোগদান করেন, তবে তাকে 'প্রধান' হিসেবে মেনে নিতে অনেকের ইগোতে আঘাত লাগে। সম্মানসূচক 'হেডস্যার' ডাকার বদলে নাম ধরে 'ক স্যার' বলে সম্বোধন করেন। এমনকি কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার থাকলে এমন রুক্ষ, রাগান্বিত বা ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় কথা বলেন, যেন প্রতিষ্ঠান প্রধান তার ঊর্ধ্বতন কেউ নন, বরং তার ক্লাসমেট! এটি যে চাকরির বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং একটি অসদাচরণ (যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ), সেটিও তারা ভুলে যান।

স্বাধীনতার অপব্যবহার ও এসিআর (ACR)-এর প্রয়োজনীয়তা

শিক্ষকরা উচ্চশিক্ষিত, তাই তাদের কাজের স্বাধীনতা দিলে ভালো ফল পাওয়া যাবে— এমনটা ভাবা হলেও বাস্তবে উল্টোটি ঘটে। স্বাধীনতা দিলে দায়িত্ববোধ না বেড়ে বরং ফাঁকিবাজির প্রবণতা বাড়ে। একজন যদি দেরিতে আসেন বা সময়ের আগে চলে যান, তখন অন্যরাও ভাবেন, "আমি কেন ঠিকভাবে চলব? আমিও একই কাজ করব।" প্রবাদে আছে, "তুমি অধম বলিয়া আমি কি উত্তম হইব না?" কিন্তু বর্তমান চিত্রটি যেন উল্টে গেছে— "তুমি উত্তম বলিয়া আমি কি অধম হইব না!"

সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই স্বেচ্ছাচারিতা কম থাকার অন্যতম কারণ হলো 'এসিআর' (Annual Confidential Report)। বছর শেষে এসিআর খারাপ হওয়ার ভয়ে অনেকেই আচরণ সংযত রাখেন। তাই এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষকদের টাইম স্কেল বা প্রমোশনের ক্ষেত্রে এই এসিআর ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

ক্ষণস্থায়ী উদ্যোগ, গ্রুপিং ও জবাবদিহিতার অদ্ভুত সংস্কৃতি

প্রতিষ্ঠান প্রধান যখন বাস্তবতার আলোকে উন্নয়নের কোনো পরিকল্পনা বা উদ্যোগ নেন, শিক্ষকরা হয়তো তা ১-২ দিন ঠিকমতো পালন করেন। তারপর আবার আগের সেই ঢিলেঢালা কর্মহীনতায় ফিরে যান। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে উন্নতি সম্ভব? আবার বিদ্যালয়ের কিছু বিষয় থাকে যা একান্তই ম্যানেজিং কমিটির (এসএমসি) আলোচনার বিষয় এবং সেখানে ৩ জন শিক্ষক প্রতিনিধিও থাকেন। কিন্তু দেখা যায়, এই বিষয়গুলো নিয়ে সাধারণ শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং করেন, উচ্চবাচ্য করেন এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। একজন শিক্ষকের মূল কাজ শ্রেণিকক্ষে, কিন্তু তারা সেটিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?

প্রতিষ্ঠান প্রধান স্বাধীন নন, কারণ তাকেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রশাসনিক এই প্রধান ব্যক্তিকে প্রায়শই তার অধীনস্থদের কাছেই অযাচিত জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হয়। শিক্ষকদের কোনো সমস্যা থাকলে তারা নিয়মানুসারে কর্তৃপক্ষকে জানাবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার বদলে তারা যে ভিন্ন ও বিশৃঙ্খল পথ বেছে নেন, তাতেই প্রমাণ হয় প্রতিষ্ঠান প্রধানরা আসলে কতটা স্বাধীন।

ফলাফল বিপর্যয় ও দায় এড়ানোর প্রবণতা

একজন আদর্শ শিক্ষকের কাজ দুর্বল শিক্ষার্থীকে টেনে তোলা, অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ রাখা। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা বা পূর্বপ্রস্তুতি অনেকেরই নেই। পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল হলে প্রতিষ্ঠান প্রধান যখন শিক্ষকদের কাছে এর কারণ জানতে চান, তখন তা যেন মহা অপরাধে পরিণত হয়! তখন ঢালাওভাবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ঘাড়ে দোষ চাপানো হয়। এমনকি উল্টো প্রতিষ্ঠান প্রধানের যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়, নিজেদের শতভাগ নির্দোষ প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা চলে।

নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন বা পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার বদলে গতানুগতিক ধারায় পড়ে থাকা এবং নতুন পদ্ধতির ছিদ্রান্বেষণেই অনেকে বেশি সময় ব্যয় করেন। পাশাপাশি কেবল ভাতা ও আর্থিক সুবিধার দিকে নজর, কোচিং বাণিজ্যের অসুস্থ প্রতিযোগিতা— এসবের মাঝে মূল পাঠদান আজ চরম উপেক্ষিত।

প্রান্তিকতায় অসহায়ত্ব ও নীরব বিধিমালা

এসএমসি বা নিয়মের মাধ্যমে যখনই মনিটরিং এবং মেন্টরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই শিক্ষকদের সাথে প্রধানের দূরত্ব বাড়ে এবং প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এই অসদাচরণের জন্য বিধিমালা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়াও প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কারণ একজন অপরাধী শিক্ষককে সমর্থন দিতে আরো কিছু সহকর্মী ঢাল হয়ে দাঁড়ান। শান্তির আশায় এবং পরিবেশ ঠিক রাখতে বিধিমালা তখন ডুকরে কাঁদে।

আর প্রতিষ্ঠান প্রধান যদি সামাজিকভাবে প্রান্তিক, অপেক্ষাকৃত কম প্রভাবশালী বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হন, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। জীবন ও সম্মান বাঁচাতে এবং মিথ্যা রোষানল থেকে বাঁচতে তিনি অনেক অন্যায় ও অসহযোগিতা নীরবে মেনে নিতে বাধ্য হন।

পরিশেষে

একটি কথা প্রচলিত আছে, "সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।" যে প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা নেই, চেইন অব কমান্ড নেই, সেখানে পিছিয়ে পড়া কখনোই এগিয়ে যেতে পারে না। এই যে অসহযোগিতা, পেশার প্রতি অবজ্ঞা এবং দলাদলি— এটি কেবল শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ও মানবিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। নীতিনির্ধারক, ম্যানেজিং কমিটি এবং সমাজকে বুঝতে হবে যে, প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ক্ষমতাহীন ও অসহায় করে রেখে কখনোই শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর শিক্ষকদেরও আত্মোপলব্ধির সময় এসেছে— শিক্ষকতা কেবল মাস শেষে বেতন গোনার চাকরি নয়, এটি মানুষ গড়ার কারিগরের এক পবিত্র ব্রত।

*** লেখক: মৃণাল কান্তি সাহা, শিক্ষক ও লেখক।

(সর্বশেষ একটি বিনীত নিবেদন— এই লেখার বিষয়বস্তু দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সকল শিক্ষক, কর্মচারী বা প্রতিষ্ঠান প্রধানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অনেক শিক্ষক অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করছেন এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে চমৎকার পরিবেশ রয়েছে। যারা নিজেদের পেশার প্রতি সৎ, শ্রদ্ধাশীল এবং নিবেদিতপ্রাণ, এই লেখাটি তাদের উদ্দেশ্য করে নয়। বরং তারা এটি উপেক্ষা করতে পারেন। লেখাটির মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষাক্ষেত্রের কিছু রূঢ় বাস্তবতা ও অবক্ষয় তুলে ধরা।)

কোন মন্তব্য নেই

Please validate the captcha.

mrinalmsc. enot-poloskun থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.